13 জন পড়েছেন
২০২২ সালে সদর উপজেলার রামডুবি সুন্দরপুর ইউনিয়নে তরুন চন্দ্রের সাথে বিয়ে হয় ¯^প্নার (ছদ্মনাম)| বিয়ের সময় ¯^প্নার বাবা মেয়ে জামাইকে ৬ লাখ টাকা যৌতুক প্রদান করে| বিয়ের পর ¯^ামীর সাথে সুখেই কাটছিল তার সংসার কিন্তু তার ¯^প্ন দুঃ¯^প্নে পরিণত হয় বিয়ের এক বছরের মধ্যে, যখন তার ¯^ামী যৌতুকের জন্য আবারও তাকে চাপ দেয়| দিনমজুর বাবার অপারগতায় ¯^প্নার উপর শুরু হয় নির্যাতন| ২০২৩ সালে তার একটি মেয়ে সন্তান জন্মগ্রহণ করে| এরপর আরো বেড়ে যায় নির্যাতনের মাত্রা| মারধোরের ফলে হাসপাতালেও ভর্তি হতে হয়েছে ¯^প্নাকে| বারবার সালিশ, মিমাংসা কিন্তু নির্যাতন কমেনি| লিগ্যাল এইডে মামলা মিমাংসা হলেও অবস্থা একই| অবশেষে ২০২৪ সালে বাবার বাড়িতে চলে আসে ¯^প্না| ৩ বছর ধরে এখন বাবার বাড়িতেই আছে সে| মামলা চলমান, যৌতুকের টাকা ফেরত কিংবা স্ত্রী ও মেয়ের ভরনপোষন কিছুই দিচ্ছে না ¯^ামী| বর্তমানে ¯^প্না নিজের এবং মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কম্পিউটার গ্র্যাফিক্স প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে|
২০২০ সালে বিয়ে হয় একই উপজেলার রোখসানা খাতুনের (ছদ্মনাম)| এক বছর পর তার মেয়ের জন্ম হয়| একেতো মেয়ে তারপর সদ্য জন্ম নেয়া মেয়ের গায়ের রং শ্যামলা হওয়ায় রোখসানাকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়| বারবার বিষয়টি মিমাংসা করে ¯^ামীর বাড়িতে গেলেও চলে শারীরিক নির্যাতন| এক সময় জানতে পারেন ¯^ামী অন্য মেয়ের সাথে সর্ম্পকে লিপ্ত| ২০২২ সালে তাকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে ডিভোর্স লেটার পাঠায় ¯^ামী| পরে মামলা দায়ের করলে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করলেও কন্যা সন্তানের কোন খোজ নেয়না এবং ভরনপোষন দেয় না| বর্তমানে সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়ে বাড়িতেই অন্যের কাপড় সেলাই করে নিজের ও মেয়ের খরচ চালান তিনি|
শুধু এই দুটি ঘটনাই নয়, প্রতিনিয়তই যৌতুক কিংবা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে নারীদেরকে| সালিশ, এমনকি মামলা করলেও সহসাই পাচ্ছেন না এসবের প্রতিকার| এখন নিজের পাশাপাশি সন্তানের ভরনপোষণ, সংসার নির্বাহ করাটাও কঠিন হয়ে দাড়িয়েছে | মামলা পরিচালনা করার পাশাপাশি নিজেদেরকে ¯^াবল¤^ী হিসেবে গড়ে তোলাটা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে|
দিনাজপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ও বেসরকারী সংগঠন পল্লীশ্রীর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন ২ জনেরও বেশি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে দিনাজপুরে| অথচ এই জেলাতেই নারী নির্যাতন ও হত্যাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল বৃহৎ আন্দোলন, ইয়াসমিন ট্রাজেডী| মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বিচারকার্যে দীর্ঘসূত্রিতা, প্রায়োগিক ক্ষেত্রে দূর্বলতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারনে নির্যাতনের প্রবণতা বাড়ছে|
তথ্যানুযায়ী, গত ২০২৫ সালে এই জেলায় নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগ দায়ের হয় ৮১৪টি| যা প্রতিদিন গড়ে ২ জনের বেশি| ২০২৪ সালেও নির্যাতনের সংখ্যা ছিল ১০৮৯টি এবং ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ১৩৬৩টি|
নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ও নারীর ক্ষমতায়নকে ফোকাস করে গড়ে ওঠা সংগঠন পল্লীশ্রী গত ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত মোট ৮৪৭ জন নির্যাতনের শিকার নারীদেরকে নিয়ে কাজ করেছে| তাদের মধ্যে ৭৩৫টি অভিযোগ সালিশের মাধ্যমে সমাধান হয়েছে| শুধু সমাধানই নয়, নির্যাতনের শিকার নারীদেরকে ¯^াবল¤^ী করতে তাদেরকে দক্ষ ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলছে সংগঠনটি| নির্যাতিত নারীদেরকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়া হচ্ছে| সেখানে তারা কম্পিউটার, সেলাই, বুটিকস, ব্যাগ ˆতরী, সুতা দিয়ে কাপড় ˆতরী, ক্ষুদ্র ব্যবসার আইডিয়া এমন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে| প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হলে তাদেরকে সক্ষমতা অনুযায়ী প্রারম্ভিক পুজি বা অর্থ সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে| যাতে করে তারা নিজের পায়ে দাড়াতে পারে|
পল্লীশ্রীর কর্মকর্তারা বলছেন, নির্যাতনের অভিযোগ সমাধানের পাশাপাশি প্রয়োজন নারীদের সম্মান ও ন্যায্যতা পাওয়ার ব্যবস্থা ও সংসার নির্বাহ এবং তাদের সন্তানদের ভরনপোষনের জন্য তাদেরকে ¯^াবল¤^ী হিসেবে গড়ে তোলা| প্রান্তিক নারীদের অধিকার রক্ষা, তাদের অধিকার আদায়ের জন্য সুশীল সমাজের সংগঠন এবং সরকারী কর্তৃপক্ষকে সাথে নিয়ে কাজ করে আসছে পল্লীশ্রী|
আর এসব নিযতনের শিকার নারীদেরকে ¯^াবল¤^ী করে তোলাটা অনেক চ্যালেঞ্জিং তথাপিও গত এক বছরে পল্লীশ্রী ৯৭ জন নিযাতনের শিকার নারীর সাথে কাজ করেছে| তাদের মধ্যে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার ৩৩ জন, যৌতুকের জন্য নির্যাতনের শিকার ১৫ জন, শারীরিক নির্যাতনের শিকার ২৯ জন| এছাড়াও জমিজমা সংক্রান্ত, মানসিক নির্যাতন, বাড়ি থেকে বের করে দেয়া, যৌন হয়রানী, পরকীয়ায় নির্যাতনসহ বিভিন্ন ভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন আরও ২০ জন নারী| গত এক বছরে ১১৫ জন নারীকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলেছে পল্লীশ্রী| তাদের মধ্যে ৪৭ জন সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়ে দর্জি হয়েছেন, ৩ জন কসমেটিকসের দোকান দিয়েছেন, ৫ জন ফেরী ব্যবসা করছেন, ১৫ জন ব্যাগ ˆতরী করছেন, অনলাইনে কাপড়ের ব্যবসা করছেন ৪ জন, দুধের ব্যবসা করছেন ৪ জন, হোটেল ও চায়ের দোকান ১৪ জন, করুস কাটা (সুতা দিয়ে কাপড় ˆতরী) ৩ জন, পিঠার দোকান একজন এবং মুদির দোকান করছেন ২০ জন নারী|
নারী নির্যাতন প্রতিরোধে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার অভিজ্ঞতায় সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক শামীম আরা বেগম জানান, বিচারকার্যে দীর্ঘসূত্রিতা, প্রায়োগিক ক্ষেত্রে দূর্বলতার কারনে নির্যাতনের প্রবণতা বাড়ছে| এজন্য দ্রুত বিচার আইনের মাধ্যমে এসব মামলা পরিচালনা ও অপরাধী যেই হোক তাকে দ্রুত বিচার আইনের মাধ্যমে তার শাস্তি কার্যকর করতে হবে| নারীরা পরনির্ভরশীল না হলে নির্যাতনের মাত্রা এমনিতেই কমে আসবে| এজন্য আমরা কাজ করছি এসব নারীরা যাতে ¯^াবল¤^ী হতে পারে| সে জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান ও প্রশিক্ষন পরবর্তী সংগঠনের ¯^ক্ষমতা অনুযায়ী প্রারম্ভিক পুজি প্রদানসহ তাদেরকে দক্ষ করে গড়ে তোলা| যাতে করে তারা নিজের পায়ে দাড়াতে পারে এবং বিভিন্ন সরকারী বা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে তাদেরকে সম্পৃক্ত করে দেওয়া হচ্ছে| ফলে অনেকেই নিজেদেরকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলেছেন|