5 জন পড়েছেন
ব্যাপকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কৃষিখাত| বিভিন্ন কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলেও কম উৎপাদনের সাথে বাজারে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা যেমন কৃষিতে আগ্রহ হারাচ্ছে তেমনি প্রান্তিক কৃষকদের মাথায় ঋণের বোঝা বাড়ছে| এখন সময় এসেছে আধুনিক পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করে উৎপাদন খরচ কমিয়ে পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে ফসল উৎপাদন| এ রকমই একটি পরিবেশ বান্ধব পদ্ধতির নাম মালচিং| অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে বেড ˆতরী করে সেই বেডে মালচিং পেপার দিয়ে ঢেকে সূর্যের আলো ও তাপ নিয়ন্ত্রণ করে কম খরচে ফসল উৎপাদনই এই পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য| এই পদ্ধতিতে আবাদ করলে আগাছা কম হয়, রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমন কম, সেচ খরচ কম হওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক কমে যায়| বিশেষ করে শীত ও বর্ষা মৌসূমে এই পদ্ধতিতে আবাদ করে কৃষকদের যেমন উৎপাদন খরচ কমে আসে তেমনি কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়|
মালচিং পদ্ধতিতে শুরুতে একসাথে কিছুটা খরচ বেশি হলেও পরে খরচ কমে যায়| এ পদ্ধতিতে জমিতে আগাছা হয় না| ফলে কৃষকদের আগাছা পরিষ্কারের ঝামেলাও নেই| চাষাবাদের শুরুতে সার দেয়ার প্রয়োজন হলেও ফসল তোলার পূর্বে আর সার দিতে হয় না| সেচ দেয়ার প্রয়োজন হলে শুধুমাত্র গাছের গোড়ায় সেচ দিলেই হয়| ফলে কৃষকদের খরচ ও ঝামেলা কম হয়| গাছও দীর্ঘদিন বেঁচে থেকে ও ফলন দেয়|
কৃষকরা জানান, এ পদ্ধতিতে জমি ˆতরির জন্য মাঝখানে দুই পাশ থেকে কেটে দেড় ফুট চওড়া করে ও ৮-১২ ইঞ্চি পরিমাণ উঁচু করে মাটির সাথে সার মিশিয়ে বেড ˆতরি করা হয়| ˆতরি বেডগুলো মালচিং পেপার দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়| মালচিং পেপারের কালো রঙের দিকটা থাকে নিচের দিকে আর রুপালি রঙের দিকটা থাকে ওপরের দিকে অর্থাৎ সূর্যের দিকে| এ পদ্ধতিতে সূর্যের আলো ও তাপ নিয়ন্ত্রণে রেখে মাটিকে রাখে ফসলের উপযোগী| পরে মালচিং পেপারের দুই পাশে নির্দিষ্ট দূরত্বে গোল গোল করে কেটে নেয়া হয়| এরপর কেটে নেয়া জায়গায় রোপণ করা হয় বীজ বা চারা| পরে তিন ফুট উঁচুতে বাঁশ ও সুতা দিয়ে ˆতরি করা হয় মাচা| এ পদ্ধতিতে প্রতি বিঘা জমিতে মরিচ চাষ করতে খরচ হয় প্রায় এক লাখ টাকা আর এক বিঘায় উৎপাদিত মরিচ বাজারে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়ে থাকে|
পঞ্চগড়ে এমন একজন কৃষক সারোয়ার হোসেন| জেলা শহরে রয়েছে তার বীজ, সার ও কীটনাশকের দোকান| ব্যবসায়ী হলেও তিনি একজন সফল কৃষক| বিভিন্ন ধরণের লাভজনক ফসল আবাদে তিনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন| এবার পঞ্চগড় জেলা সদরের চানপাড়া গ্রামে তালমা নদীর পাড়ে তিনি মালচিং পদ্ধতিতে মরিচ চাষ করেছেন| ইতোমধ্যে তার মরিচ ক্ষেতে ফুল ধরেছে| কিছুদিনের মধ্যে ফল আসবে| সারোয়ার জানান, এবার তিনি পরীক্ষামূলকভাবে ২০ শতক জমিতে মালচিং পদ্ধতিতে মরিচ চাষ করেছেন| এ পর্যন্ত তার খরচ হয়েছে ৩৫ হাজার টাকার মত| সামনে আর বেশি খরচ নেই| সপ্তাহে একদিন কীটনাশক স্প্রে করলেই হবে| তার আশা এই জমি থেকে তিনি লক্ষাধিক টাকার কাঁচা মরিচ বিক্রি করতে পারবেন| তিনি জানান, এবার তিনি সফল হলে এই পদ্ধতিতে আগামীতে আরও বড় পরিধিতে মরিচ চাষ করবেন|
পঞ্চগড় সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আসাদুন্নবী জানান, এ উপজেলার কৃষকরা এখন মালচিং পদ্ধতিতে সবজি চাষ করে ভালো সফলতা অর্জন করছেন| এই পদ্ধতিতে মরিচ, বেগুন, টমেটো, লাউ ইত্যাদি সবজি আবাদ করে কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন| চলতি মৌসূমে এ উপজেলায় পাঁচ হেক্টর জমিতে মরিচ চাষ করা হয়েছে| বিশেষ করে খরিপ-১ ও খরিপ-২ মৌসূমে মরিচ আবাদ করে বেশি লাভবান হচ্ছে কৃষকরা| কারণ বৃষ্টি থাকায় এই সময়টাতে নিচু এলাকার ক্ষেতের মরিচ গাছ মরে যায়| তাই বাজারেও দাম থাকে বেশ ভাল| আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের এই পদ্ধতিতে সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ করছি| এ পদ্ধতি পুরো উপজেলার কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে অর্থনীতির চাকা ঘুরে দাঁড়াবে এমনটাই প্রত্যাশা করছেন এই কৃষিবিদ|