6 জন পড়েছেন
বেশি ফলন নিশ্চিতে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি মোকাবিলায় ফুলবাড়ীসহ আশপাশের উপজেলায় রোপা আমন ধানের চারা দোগাছি তৈরিতে ব্যস্ত্ম সময় পার করছেন কৃষক। বাংলা আষাঢ় মাসের শুরম্ন থেকেই দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার বিস্ত্মীর্ণ মাঠজুড়ে শুরম্ন হয়েছে রোপা আমন ধানের চারা প্রস্তুত ও দোগাছি (ডাবল ট্রান্সপস্নান্টিং) তৈরির কর্মযজ্ঞ। শ্রাবণ মাসে এই চারা লাগানো শুরম্ন হবে।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্ষার অনুকূল আবহাওয়া ও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের কারণে উপজেলার আলাদিপুর, আমবাড়ী, বালুপাড়া, বাসুদেবপুর, মহেশপুর, বারাইহাট, খয়েরবাড়ীসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের মাঠে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত্ম কৃষক-শ্রমিকদের ব্যস্ত্ম সময় কাটছে কাদামাখা জমিতে। এজন্য বীজতলায় ২৫ থেকে ৩০ দিন বয়সী সুস্থ চারা তুলে দুই থেকে তিনটি করে একত্রে দোগাছি তৈরি করা হচ্ছে। মূল জমিতে পানি নেমে গেলে কিংবা জমি প্রস্তুত হলেই এসব চারা রোপণ করা হবে।
বেতদিঘী ইউনিয়নের মহেশপুর গ্রামের শিক্ষকতার পাশাপাশি কৃষিকাজ করেন আব্দুল মান্নান। তিনি বলেন, 'এবার বৃষ্টিপাত ভালো হয়েছে। তাই সময়মতো দোগাছি তৈরি করছি। দোগাছি করে জমি লাগালে ফলন ভালো হয় এবং বেশি পানিতেও চারা মারা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে না। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভালো ফলনের আশা করছি।'
আলাদীপুর ইউনিয়নের বাসুদেবপুর গ্রামের কৃষক আমিনুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকের মজুরি আগের তুলনায় বেড়েছে। তারপরও নির্ধারিত সময়ে রোপণ শেষ করতে সবাই মাঠে কাজ করছেন। ভালো ফলন হলে খরচ অনেকটাই পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
একই ইউনিয়নের মেলাবাড়ী গ্রামের কৃষক ও কলেজ শিক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, রোপা আমন ধানের সাধারণ চারা লাগালে একরপ্রতি যদি ৪০ মণ ধান হয়, দোগাছি করে জমি লাগালে সেখানে ফলন হবে ৫০ মণের ওপরে। দোগাছিতে চারার কাঠি কম লাগে এবং দ্রম্নত মাটিতে শিকড় লেগে যায়। তাই দোগাছি করে জমি লাগানো দিন দিন বাড়ছে এবং তার সুফল কৃষক পাচ্ছেন।
কৃষি বিভাগ জানায়, সাধারণভাবে বীজতলায় চারা বেশি দিন থাকলে তা বয়স্ক হয়ে যায় এবং মূল জমিতে লাগানোর পর কুশি কম বের হয়। দোগাছি পদ্ধতিতে প্রথমবার স্থানান্ত্মরের কারণে চারা সতেজ থাকে এবং দ্বিতীয়বার রোপণের পর দ্রম্নত নতুন শিকড় ও অধিক কার্যকর কুশি গজায়। এতে গাছ শক্তপোক্ত হয়, প্রতিকূল আবহাওয়া সহ্য করতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত্ম শীষ ও দানার সংখ্যা বেড়ে ফলনও বেশি হয়।
সারিবদ্ধভাবে চারা রোপণ করলে গাছ পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পায়, আগাছা দমন, সার প্রয়োগ ও পরিচর্যা সহজ হয়। এজন্য সারি থেকে সারির দূরত্ব ২০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার এবং গোছা থেকে গোছার দূরত্ব ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রতি গোছায় দুই থেকে তিনটির বেশি চারা না লাগানো এবং অগভীরভাবে রোপণ করাও ফলন বাড়ার জন্য গুরম্নত্বপূর্ণ।
এছাড়া চারা রোপণের পর সুষম সার প্রয়োগ, নিয়মিত আগাছা দমন, রোগ-পোকা পর্যবেক্ষণ এবং সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছে কৃষি বিভাগ। এসব প্রযুক্তি অনুসরণ করলে কাঙ্িক্ষত ফলন অর্জন করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশিস্নষ্ট কর্মকর্তারা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাইফ আব্দুলস্নাহ মোস্ত্মাফিন জানান, রোপা আমন ধানের 'দোগাছি' বা ডাবল ট্রান্সপস্নান্টিং একটি বিশেষ ও কার্যকর চাষ পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে বীজতলা থেকে চারা তুলে সরাসরি মূল জমিতে রোপণ না করে প্রথমে একটি অন্ত্মর্র্বতী নিরাপদ জমিতে ঘন করে লাগানো হয়। পরে চারাগুলো কিছুটা বড় ও শক্ত হলে আবার সেখান থেকে তুলে চূড়ান্ত্মভাবে মূল জমিতে রোপণ করা হয়। যেহেতু চারাকে দুইবার রোপণ করা হয়, তাই এর নাম দোগাছি পদ্ধতি।
ওই কর্মকর্তা জানান, নিচু ও বন্যাপ্রবণ এলাকায় কিংবা যেখানে দেরিতে রোপা আমন লাগাতে হয়, সেখানে এ পদ্ধতি বিশেষভাবে কার্যকর। অনেক সময় মূল জমি বন্যার পানিতে ডুবে থাকায় সরাসরি চারা লাগানো সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে দোগাছি পদ্ধতিতে চারাকে নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করা যায় এবং পানি নেমে গেলে শক্ত ও স্বাস্থ্যবান চারা মূল জমিতে রোপণ করা সম্ভব হয়।